ডেস্ক রিপোর্ট
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের এবার বলকান অঞ্চলের কোনো একটি দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ব্রিটিশ সরকার৷
ব্রিটিশ হোম অফিস বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাজ্যের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ (ফেরত পাঠানোর কেন্দ্র) তৈরি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন৷ মূলত যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি এবং যাদের সব ধরনের আপিল আবেদনের সুযোগও শেষ হয়ে গেছে, তাদেরকেই সেই রিটার্ন হাবে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে৷
সরকারি সূত্র অনুসারে, এই আলোচনাটি এখনও ‘একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়েছে৷ শেষপর্যন্ত যদি আলোচনাটি সফল হয়, তাহলে যুক্তরাজ্য থেকে পাঠানো প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীর জন্য অর্থ দেয়া হবে বলকান অঞ্চলের আয়োজক দেশটিকে৷
লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে কিয়ের স্টারমার ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীবাহী ছোটো নৌকার আগমন থামিয়ে নিট অভিবাসন ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷
ঋষি সুনাকের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাজ্যের পূর্ববর্তী রক্ষণশীল সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় পাঠাতে একটি চুক্তি করেছিল৷ চুক্তি বাস্তবায়নে নেয়া হয়েছিল প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ৷ কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্তে একজন আশ্রয়প্রার্থীকেও রুয়ান্ডায় পাঠানো সম্ভব হয়নি৷ লেবার পার্টি ক্ষমতায় এসে বাতিল করেছে সেই চুক্তিটি৷
এই প্রকল্পের বিপরীতে এখন বলকান অঞ্চলকে বেছে নিতে যাচ্ছে দেশটির নতুন সরকার৷
কেন এই পরিকল্পনা?
তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ তৈরি করা হলে সরকার বিশেষ সুবিধা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ইরান বা সোমালিয়ার মতো দেশগুলো থেকে আসা কোনো আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলেও তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না৷ তাই এমন সব আশ্রয়প্রার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগ পর্যন্ত রিটার্ন হাবে রাখা সম্ভব হবে৷
এমন ‘রিটার্ন হাব’ তৈরির বিষয়ে সম্মত হয়েছে ইউরোপীয় কমিশনও৷ তাদের দেখাদেখি যুক্তরাজ্যও এই বিকল্প ভাবনায় মনোনিবেশ করছে৷
চলতি মাসের শুরুতে, ‘অভিবাসন ব্যবস্থাপনায়’ গতি আনতে ‘উদ্ভাবনী’ সমাধান হিসাবে রিটার্ন হাব তৈরি করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রস্তাব রাখে ইউরোপীয় কমিশন৷ তবে এমন প্রকল্প থেকে অবশ্যই শিশু, অভিভাবকবিহীন শিশুদের বাদ দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে৷
তবে, তৃতীয় কোনো দেশে এমন ‘রিটার্ন হাব’ তৈরি করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশটির অনুমতি সাপক্ষে একটি চুক্তি করতে হবে৷ যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার পশ্চিম বলকানের দেশগুলোর প্রতি আগ্রহী৷ এ অঞ্চলটিতে রয়েছে আলবেনিয়া, সার্বিয়া এবং বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনা৷
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি মনে করে, এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত হলে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি যেমন গতি পাবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় হবে৷
গত বছর, আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত নয় হাজার ১৫১ জনকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাজ্য৷ সংখ্যাটি ২০২৩ সালের তুলনায় অন্তত ৩৬ শতাংশ বেশি৷
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারাও মনে করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বাজেটের উপর চাপ কমবে এবং অর্থ সাশ্রয় হবে৷ কারণ, প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা তাদের আইনি দায়িত্ব৷ কিন্তু আবাসন সংকটের কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে৷ এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে৷
আসতে পারে আইনি বাধা
তৃতীয় দেশে ‘রিটার্ন হাব’ তৈরির এই পরিকল্পনা আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের অধিকার বিষয়ক দাতব্য সংস্থাগুলোর আপত্তির কারণে আইনি বাধার মুখেও পড়তে পারে৷
এর আগের সরকারের রুয়ান্ডা পরিকল্পনাও আইনি বাধার মুখে পড়েছে৷ এমনকি, ইটালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি আলেবনিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে সেই দেশটিতে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রও নির্মাণ করেছে৷ কিন্তু আইনি বাধার মুখে সেখানে আশ্রয়প্রার্থী পাঠিয়েও ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে মেলোনির সরকার৷
যুক্তরাজ্য সরকার অবশ্য এসব দিক বিবেচনায় রেখে তাদের পরিকল্পনাটি করছে৷ সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, এই সমস্যাটি ‘‘বিশ্বজুড়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং আমরা সবসময় বলে আসছি, আন্তর্জাতিক সমস্যার একটি আন্তর্জাতিক সমাধান প্রয়োজন৷’’
তিনি বলেন, ‘এজন্যই আমরা উদার মন নিয়ে সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় বিকল্পের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি৷ সাশ্রয়ী, কার্যকর এবং আইনি বাধা পেরোতে সক্ষম হবে এমন পরিকল্পনাই আমরা বিবেচনা করবো ৷’
কড়া সমালোচনার মুখে প্রাথমিক আলোচনা
শরণার্থী কাউন্সিলের এনভার সলোমন সরকারের এমন প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন৷ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘‘খবরের কাগজের শিরোনাম হওয়ার কৌশল এবং আগে-পরে না ভেবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তগুলো (নি-জার্কিং) বেশ ব্যয়বহুল৷ এই ধরনের উদ্যোগ কার্যকর সমাধানের চেয়ে কঠিন শোনায়৷’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা আমাদের কাজ করতে গিয়ে জেনেছি, মানুষের সঙ্গে কাজ করা এবং তারা যে দেশ থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যেতে সহায়তা করাটা আলবেনিয়ার মতো কোনো দেশে পাঠানোর চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ৷ কারণ, সেখানে তাদের আটক রাখা হবে এবং অনিবার্যভাবে কারাগারের মতো পরিস্থিতি হবে৷’’
বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেছেন, ‘‘লেবার পার্টি এখন অফশোর প্রক্রিয়াকরণের দিকে নজর দিচ্ছে৷ আর তা প্রমাণ করে, রুয়ান্ডা পরিকল্পনা বাতিল করা তাদের ভুল ছিল৷ এটাও প্রতীয়মান হয় যে, মানবপাচারকারী চক্রগুলো ভেঙে দিতে তাদের প্রচেষ্টা একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে৷’’
তিনি আরো দাবি করেন, লেবার পার্টি ‘আমাদের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে’ এবং তাদের ‘জরুরি ভিত্তিতে রুয়ান্ডা প্রকল্প শুরু করা উচিত’৷
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ড্যাভি বলেছেন, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া মানুষের সংখ্যাটি ‘সত্যিই উদ্বেগজনক’৷
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, এ বছর এখন পর্যন্ত ছোট নৌকায় করে পাঁচ হাজারেরও বেশি অভিবাসী যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন৷
হ্যারোগেটে দলের বসন্তকালীন সম্মেলনের সময় সাংবাদিকদের স্যার এড ড্যাভি আরো বলেন, ‘‘আমি খুশি যে সরকার রুয়ান্ডা প্রকল্পটি বাতিল করেছে৷ কারণ এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতো না৷’’
তিনি বলেন, ‘আসলে, ওই প্রকল্পের মাধ্যমে কাউকে পাঠানো সম্ভব হয়নি৷ কিন্তু প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছিল৷ কিন্তু এখন যদি তাদের কাছে এর চেয়ে আরো ভালো প্রকল্প থাকে, যেটি কার্যকর হবে, আমরা সেটা অবশ্যই দেখব৷’
তিনি করদাতাদের অর্থ সাশ্রয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদ দিয়েছেন৷ সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস।
