এশিয়াআবু উবায়দা নিহত হওয়ায় ইসরায়েল কেন এত খুশি

আবু উবায়দা নিহত হওয়ায় ইসরায়েল কেন এত খুশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আবু উবায়দা মুখ ঢেকে গণমাধ্যমে আসেন তিনি। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে বহু গান। যার একটি, ‘হে আবু উবায়দা, তোমার ইচ্ছাশক্তি দৃঢ়, তোমার কথাই বুলেটের গুলি’। তিনি আবু উবায়দা। বহু ফিলিস্তিনি বীরের মতো তিনিও শহীদ হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামের অকুতোভয় এই নায়কের প্রয়াণ তাই আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম বিগ্রেডের মুখপাত্র আবু উবায়দাকে শনিবার সপরিবারে হত্যা করেছে তারা। যদিও হামাসের পক্ষ থেকে এ খবর এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তবে হামাসের এই নীরবতা ফিলিস্তিনের মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষের হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে।

গাজার নির্বাচিত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হামাসের সশস্ত্র সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম বিগ্রেডের মুখপাত্র ছিলেন আবু উবায়দা। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর নতুন করে তিনি সারা দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে ওঠেন।

গত দুই দশকে বহুবার তাঁকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছে ইসরায়েল। ৭ অক্টোবরের পর অন্তত দুইবার তাঁকে লক্ষবস্তু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই। গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে হামাসের ‘তথ্যযুদ্ধের প্রধান’ বলে অভিহিত করে।

হামাস কখনোই তাঁর প্রকৃত নাম, চেহারা বা কোনো ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেনি। ‘আবু উবায়দা’ নামটিও তাঁর আসল নাম নয়। ছদ্ম এই নামটি ২০০০ সালের পরে ধারণ করেন তিনি। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. নামে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও খ্যাতনামা সেনাপতি ছিলেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকে উৎসাহ নিয়েই এই নামটি বেছে নেওয়া তাঁর।
আবু উবায়দা সারা বিশ্বে পরিচিত গণমাধ্যমে দেওয়া তাঁর ভাষণের জন্য। হামাসের পক্ষে তিনিই যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য ও সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরতেন। ইসরায়েল তাঁকে বহুবার হত্যার চেষ্টা করেছে। এ কারণে তাঁর আসল পরিচয় গুরুত্ব দিয়ে গোপন রাখার চেষ্টা করেছে হামাস। তাঁকে সব সময় সামরিক পোশাকে দেখা গেছে। আরবদের ঐতিহ্যবাহী লাল কেফিয়া দিয়ে মুখ ঢাকা থাকতেন বলে দুটি চোখ ছাড়া তাঁকে চেনার কোনো উপায় ছিল না।

৭ অক্টোবরের পর আবু উবায়দা মুক্তিসংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে আরব বিশ্বের একটা বড় অংশ তাঁকে বীর মনে করেন। তাঁর নামে স্লোগান হয় সেখানে। গাওয়া হয় গানও। তাঁর এই জনপ্রিয়তা ইসরায়েলের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। তিনবার তাঁর বাড়িতে বোমা ফেলেছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা কোনো কোনো দেশ তাঁকে সন্ত্রাসী মনে করে।

২০০৫ সালে তিনি নিজেই একজন সাংবাদিককে জানান, তাঁর পরিবার ১৯৪৮ সালের ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূমি থেকে ইহুদিবাদী মিলিশিয়াদের হাতে উচ্ছেদের শিকার হয়ে গাজার একটি গ্রামে আশ্রয় নেয়। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, ওই সময় তাঁর বয়স ছিল বিশের কোঠায়। অর্থাৎ তিনি আশির দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি কোনো একসময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো আল-কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশ্যে আসেন আবু উবায়দা। ওই বছরের অক্টোবরে গাজার উত্তরাঞ্চলে ইসরায়েলি স্থল অভিযান চলাকালে তিনি সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধের আপডেট দেন। গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

২০০৪ সালে হামাস আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যম অফিস প্রতিষ্ঠা করে। এর পর থেকে আবু উবায়দা একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গণমাধ্যমে হামাসের হয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া, হামাসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রেকর্ড করা বক্তৃতা প্রকাশ করার কাজটি তিনি করতেন।

২০০৬ সালে প্রথমবার উবায়দা বড় ধরনের ঘোষণা নিয়ে মিডিয়ার সামনে আসেন। ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে বন্দী করার খবর প্রকাশ করেন তিনি। এরপর ২০১৪ সালের যুদ্ধে আরেক ইসরায়েলি সেনা শাউল অ্যারনকে বন্দী করার খবরও তিনিই দেন। তাঁর পরিচয়পত্র নম্বর পর্যন্ত তিনি প্রকাশ করেন ওই সময়। শুরুতে ইসরায়েল এই তথ্য অস্বীকার করলেও পরে তারা জানায়, অ্যারন নিহত হয়েছেন, তাঁর দেহ হামাসের কাছে রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর আবু উবায়দা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বক্তৃতা নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে আসতে থাকেন। যুদ্ধ শুরুর দুদিন পর তিনি হুঁশিয়ারি দেন, গাজার প্রতিটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে একজন করে ইসরায়েলি বন্দী নিহত হবেন।

এর কয়েক দিন পর তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ওই বছরের ১১ দিনের যুদ্ধের পরই বড়সর আক্রমণের কথা ভাবতে থাকে হামাস। আবু উবায়দাহ জানান, প্রায় সাড়ে চার হাজার যোদ্ধা এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার যোদ্ধা সরাসরি মাঠের লড়াইয়ে অংশ নেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ কমান্ডের অংশ ‘গাজা ডিভিশন’ ধ্বংস করা।

আবু উবায়দার ভাষণের সময় আরবের বিয়ের অনুষ্ঠান থেমে যায়। তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকা শিশু-কিশোররা টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে থাকে। কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানিও ইরানের বিপক্ষে ফিলিস্তিনের ফুটবল ম্যাচের সময় তাঁর বক্তৃতা দেখতে থেমেছিলেন।

আরব বিশ্বের কাছে আবু উবায়দা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতীক।

সুত্রঃ আল-জাজিরা, মিডলইস্ট আই, দ্য প্যালেস্টাইন ক্রনিকল অবলম্বনে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ সংবাদ

অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় ৪ বাংলাদেশি আটক

প্রবাস ডেস্ক ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে চার বাংলাদেশিকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শুক্রবার (২৮ আগস্ট)...

ইউরোপে যাওয়ার পথে সমুদ্রে ডুবে ৩৭ অভিবাসীর মৃত্যু

প্রবাস ডেস্ক উন্নত জীবনের আশা আর নিজ দেশে চলামান নৃশংসতা থেকে বাঁচতে সমুদ্রে পথে ইউরোপে পাড়ি দিচ্ছিলেন কয়েক ডজন অভিবাসন...

শিগগিরই বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে

ঢাকা অফিস সরকারের অব্যাহত সফল প্রচেষ্টার ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ...

পাঁচ বছরে মালয়েশিয়া-ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ডকে ছাড়াবে বাংলাদেশ

প্রবাস ডেস্ক মাত্র পাঁচ বছর পরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।...

যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার পরিকল্পনা তহবিলে নতুন শর্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক যুক্তরাষ্ট্রে নিম্নআয়ের ও বিমাবিহীন মানুষের পরিবার পরিকল্পনা সেবায় দেওয়া সরকারি তহবিলে নতুন শর্ত আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেছে...

যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি শ্রমিক ভিসার পরিবর্তন পুনর্বিবেচনার নির্দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী কৃষি শ্রমিকদের ভিসা কর্মসূচিতে মজুরি কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। আদালত বলেছে,...

বিশেষ সংবাদ

অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের সময় ৪ বাংলাদেশি আটক

প্রবাস ডেস্ক ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে...

ইউরোপে যাওয়ার পথে সমুদ্রে ডুবে ৩৭ অভিবাসীর মৃত্যু

প্রবাস ডেস্ক উন্নত জীবনের আশা আর নিজ দেশে চলামান নৃশংসতা...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন