ডেস্ক রিপোর্ট
জার্মানিতে বসবাসরত শরণার্থীদের মধ্যে জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-ভীতি সম্পর্কিত উদ্বেগ বেড়ে চলেছে এবং জার্মান সমাজে তারা নিজেদের অনাহূত ভাবছেন৷ একইসঙ্গে, শরণার্থীদের মধ্যে নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদনের সংখ্যাও তীব্রভাবে বেড়েছে৷ একটি দীর্ঘমেয়াদি নতুন সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে৷
বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চ (ডিআইডাব্লিউ বার্লিন) বুধবার এই সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে৷ এতে দেখা গেছে, শরণার্থীদের মধ্যে বিদেশি-ভীতি সম্পর্কিত উদ্বেগ বেড়েছে৷ ২০১৯ সালে এই উদ্বেগ ছিল এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে৷ চার বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে৷
জার্মানিতে বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী আসার এক দশক পর প্রকাশিত হলো গবেষণাটি৷ এমন একটি দশক ধরে গবেষণাটি করা হয়েছে, যখন দেশটিতে অভিবাসনবিরোধী অতি ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) এর উত্থান হয়েছে৷
কেন বাড়ছে বিদেশি-ভীতি সম্পর্কিত উদ্বেগ?
গবেষকেরা শরণার্থীদের কাছে জানতে চেয়েছেন: ‘‘আপনি কি এখন জার্মানিতে স্বাগত বোধ করছেন?’’
ডিআইডাব্লিউ-এর সমীক্ষা অনুসারে, ৬৫ শতাংশ শরণার্থী বলেছেন, তারা ২০২৩ সালে স্বাগত বোধ করেছেন৷ ২০১৭ সালেও এই সংখ্যা ছিল ৮৪ শতাংশ৷ ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ৭৮ শতাংশে৷
২০২৩ সালে এসে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ শরণার্থী বিদেশিদের প্রতি ভয় সম্পর্কিত উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন৷ ব্যক্তিভেদে এই উদ্বেগের মাত্রা কম-বেশি ছিল৷ ২০১৯ সালে এমন উদ্বেগ ছিল প্রতি তিন জনের একজনের মধ্যে৷
জরিপে অংশ নেয়া অনেকেই বলেছেন, জাতি, ভাষা বা নামের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তারা৷ ৩২ শতাংশ শরণার্থী আবাসন খুঁজে পাওয়ার সময়, ১৮ শতাংশ চাকরির আবেদনের সময় এবং ১৪ শতাংশ শরণার্থী কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন৷
জার্মানির পশ্চিম অংশের তুলনায় পূর্ব অংশে কর্মরত শরণার্থীরা তুলনামূলক বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে৷ পূর্ব জার্মানিতে পুরুষ শরণার্থীরা আবাসন এবং কর্মসংস্থানে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, যার মধ্য দিয়ে জার্মান সমাজের আঞ্চলিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷
কতজন শরণার্থী নাগরিকত্ব চাইছেন?
নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পরও ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জরিপে অংশ নেয়া ৯৮ শতাংশ শরণার্থী জার্মান নাগরিকত্ব অর্জনে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন৷ তাদের মধ্যে অনেকে নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করেছেন এবং অনেকে নাগরিকত্ব পেয়েও গেছেন৷ নাগরিকত্ব পাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ২০২১ সালে ছিল দুই দশমিক এক শতাংশ৷ ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে সাত শতাংশ৷
নাগরিকত্ব অর্জনের দিক থেকে এগিয়ে আছেন সিরীয় শরণার্থীরা৷ ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটি থেকে আসা ২৯ দশমিক চার ভাগ শরণার্থী নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করেছেন৷ সিরীয় শরণার্থীদের ১৩ দশমিক এক ভাগ তা অর্জনও করেছেন৷
নতুন করে নাগরিকত্ব পাওয়া শরণার্থীদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধাটি গ্রহণ করেছেন৷ অর্থাৎ জার্মান নাগরিকত্ব অর্জনের পাশাপাশি নিজ দেশের নাগরিকত্বও ধরে রেখেছেন৷
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কার্যকর হয়েছিল জার্মানির নতুন নাগরিকত্ব আইন৷ এই আইনে নাগরিকত্ব পেতে জার্মানিতে বসবাসের সময়সীমা আট থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে আনা হয়৷ গবেষকেরা বলছেন, এ কারণে শরণার্থীদের মধ্যে নাগরিকত্ব অর্জনের হার বেড়েছে৷
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির জাতীয় নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী এএফডি তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেরা ফলাফল করেছে৷ ২০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়৷
এএফডির উত্থান ঠেকাতে জার্মানির নতুন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার সরকার অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে৷ সীমান্তে কড়া নজরদারি, শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচি স্থগিতসহ অনিয়মিত অভিবাসন ইস্যুতে নানা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে তার সরকার৷
সূত্র: ডয়চে ভেলে।
