ডেস্ক রিপোর্ট
যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়েছে৷ এই নতুন অভিবাসন চুক্তিটি উত্তর ফ্রান্সের উপকূলে জড়ো হওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে৷ তবে ইংলিশ চ্যানেল হয়ে ছোট নৌকায় গোপনে যাত্রার প্রবাহ এখনও থামেনি৷
৩০ বছর বয়সি মিশরের নাগরিক আদনান (ছদ্মনাম) মাত্র দুই দিন আগে কালে শহরে পৌঁছেছেন৷ শহরের কেন্দ্রস্থলে কয়েকটি অস্থায়ী তাঁবুর মধ্যে একটিতে থাকেন তিনি৷ তাঁবুর কাছেই বসে তিনি মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে পাচারকারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন৷
তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করব চ্যানেল পার হওয়ার, যত দ্রুত সম্ভব৷ ওরা যখন লোকজনকে আটক করে ফেরত পাঠানো শুরু করবে তার আগেই আমাকে যেতে হবে।’
চুক্তি অনুযায়ী, ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো প্রতিটি অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হবে৷ আর বিনিময়ে লন্ডন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফ্রান্সে অবস্থানরত একজন অভিবাসীকে গ্রহণ করবে, যিনি অনলাইনে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন৷
তবে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা আছে৷ এমনকি অভিবাসীদের সহায়তা করা সংস্থাগুলোর জন্যও বিষয়টি অস্পষ্ট৷ কালেভিত্তিক সংস্থা উবেরজ দে মিগ্রঁ-এর মানবিক প্রকল্প চ্যানেল ইনফো প্রজেক্ট-এর সমন্বয়ক গ্লোরিয়া চিয়াচ্চো বলেন, “এটা নতুন এক নীতি, কিন্তু একেবারে অযৌক্তিক৷ এমন জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আসলে আমরা নিজেরাও বোঝার চেষ্টা করছি৷ প্রতিবার এমন নতুন আইন এলে অভিবাসীরা আতঙ্কে পড়ে যায়৷’
গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে ছোট নৌকায় এসে পৌঁছানো অভিবাসীদের আটক করা শুরু হয়েছে৷
তবে আদনান বলেন, ‘আমি এমন একজনকে চিনি মাত্র দুই দিন আগে ইংল্যান্ডে পৌঁছেছেন এবং তাকে এক হোটেলে রাখা হয়েছে, যেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের শুরুতে রাখা হয়৷’
তিনি স্বীকার করেন, যদি প্রমাণ পান যে মানুষকে সত্যিই যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চ্যানেল পার হওয়ার ঝুঁকি হয়তো নেবেন না৷ সেক্ষেত্রে তিনি ফ্রান্সেই আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন৷
আদনানের এক বন্ধু ওয়ালিদ (ছদ্মনাম) এক সপ্তাহ ফ্রান্সে থাকার পর মত বদলেছেন৷ তিনি মিশরে ফিরে যেতে চান৷ ওয়ালিদ বলেন, ‘এখানে বেঁচে থাকা খুব কঠিন৷ রাস্তায় থেকে জীবনযাপন একেবারেই কষ্টকর৷’
তাঁবুর পাশের প্রতিবেশী ৪৫ বছর বয়সি মোহাম্মদ জাওয়াদ যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে যেতে চান৷ তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ হবে৷ আর আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া সফল হওয়ার আশা তিনি খুব একটা করছেন না৷
সিরিয়া থেকে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে বের হয়ে আসা মোহাম্মদ জাওয়াদ মূলত চিকিৎসার জন্য ইউরোপে এসেছেন৷ তিনি ফ্রান্সেই চিকিৎসা নিতে চান৷ কিন্তু আশ্রয়ের আবেদন করলে তাকে স্লোভেনিয়ায় ফেরত পাঠানো হতে পারে, কারণ তিনি প্রথম ইইউ–তে প্রবেশ করেছেন ওই দেশ দিয়ে৷
গ্লোরিয়া চিয়াচ্চো বলেন, “মানুষ এখনও চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে৷ কারণ অনেকের সত্যিই অন্য কোনো বিকল্প নেই৷’’
অবিরাম প্রবাহ
ব্রিটিশ সংস্থা রিফিউজি অ্যাকশন জানিয়েছে, “নাবালক আশ্রয়প্রার্থীরা ছাড়া ছোট নৌকায় এসে পৌঁছানো সব অভিবাসীকেই আটক করার ঝুঁকি রয়েছে৷ তবে বাস্তবে এটি নির্ভর করবে আটককেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা এবং পুরো প্রক্রিয়া কত দ্রুত হয় তার উপর৷’’
১৩ আগস্ট ভোরে উত্তর ফ্রান্সের হার্দলো সৈকতে একটি অভিযান পর্যবেক্ষণ করে বার্তা সংস্থার এএফপির একজন সাংবাদিক। ওই সময় পুলিশের জেন্ডারমেরি শাখাকে দ্রুতগতিতে ছুটতে দেখা যায়৷ সমুদ্রে একই সময়ে নৌবাহিনীর টহল নৌকা ও জেন্ডারমেরি মেরিটাইমের জাহাজ সক্রিয় থাকে। কারণ কয়েক মিনিট আগে প্রায় ৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ছোট নৌকা রওনা হয়েছে৷ যাত্রীদের মধ্যে অর্ধেকেরও কমের গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল৷
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নৌকাটি সৈকতের কাছাকাছি ঢেউ আর বাতাসে দুলতে থাকে৷ যাত্রাপথে চার জন অভিবাসী হাল ছেড়ে দিয়ে নেমে যান৷ তারপর নৌকাটি ঘন কুয়াশার মধ্যে দিক পরিবর্তন করে ইংল্যান্ডের দিকে ছুটে যায়৷
এমন যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ সোমবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে ফরাসি জলসীমায় মোট ৩০০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে৷ একই সময়ে উত্তরাঞ্চলীয় ডানকের্কের কাছে এক সোমালি নারী প্রাণ হারিয়েছেন৷ চলতি বছরে ফ্রান্স-ব্রিটেন সীমান্তে এ নিয়ে ১৯তম মৃত্যু ঘটনা নথিভুক্ত হলো৷
তবুও অনেকেই সফলভাবে ইংল্যান্ডে পৌঁছাচ্ছেন৷ নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই হাজারের বেশি অভিবাসী ছোট নৌকায় চ্যানেল পার হয়ে যুক্তরাজ্যে গেছেন বলে সর্বশেষ ব্রিটিশ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে৷
সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস।
