আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার করা আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আলবেনিয়ার শেনজেন ও জাদারে নির্মাণ করা আশ্রয়কেন্দ্র দু’টির নির্মাণ খরচ ইতালির ভূখণ্ডে পরিচালিত একই ধরনের কাঠামোর তুলনায় অন্তত সাত গুণ বেশি৷
দাতব্য সংস্থা অ্যাকশনএইড ইতালি এবং ইতিালির বারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে৷ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আলবেনিয়ায় ইতালির অভিবাসী প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, অকার্যকর এবং আইনত প্রশ্নবিদ্ধ৷
এ নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজি হয়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স৷
ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি আলবেনিয়ায় তৈরি করা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে তার কঠোর অভিবাসন নীতির ভিত্তি হিসেবে দেখেন৷এই প্রকল্পটিকে ‘সম্ভাব্য মডেল’ হিসেবে দেখছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ৷
যা রয়েছে প্রতিবেদনে
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আলবেনিয়ান আশ্রয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র দু’টি নির্মাণে সাত কোটি ৪২ লাখ ইউরো খরচ করেছে ইতালি সরকার৷ এতে আরো উল্লেখ রয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীর শয্যা প্রতি ব্যয় এক লাখ ৫৩ হাজার ইউরোর বেশি৷
তুলনামূলক বিশ্লেষণে অ্যাকশনএইড ও বারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়েছে, সিসিলির পোর্তো এম্পেদোকলে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ৫০ শয্যার একটি আটককেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ছিল ১০ লাখ ইউরো৷ অর্থাৎ শয্যা প্রতি খরচ ২১ হাজার ইউরোর কিছু বেশি৷
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘আলবেনিয়া প্রকল্পটি ইতালির অভিবাসন নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল, অমানবিক এবং অকার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে৷’
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ইতালি গত বছর আলবেনিয়ান কেন্দ্র পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ইউরো অর্থ দিয়েছে৷ এই অর্থের বিনিময়ে মাত্র পাঁচ দিনের জন্য মোট ২০ জন অভিবাসীকে রাখার জন্য কেন্দ্রটি চালু ছিল৷
প্রতিবেদনটিতে ইতালির প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে৷ দেশটিতে প্রত্যাবাসনের হার ২০১৪ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে৷ শুধু তাই নয়, ইতালির ভূখণ্ডে নির্মিত অনেক শরণার্থী অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে শত শত আসন ফাঁকা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে৷
অ্যাকশনএইডের ফ্যাব্রিজিও কোরেসি বলেছেন, এমন প্রেক্ষাপটে জাদারের কেন্দ্রটি ব্যবহার করা ‘সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক৷’
বিরোধী দলের সমালোচনা
প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে দেশটির প্রধান বিরোধী দল মধ্য-বামধারার ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি)৷ তারা বলেছে, এর মধ্য দিয়ে দেশের জনগণের সম্পদের অপচয় করছে সরকার৷
পিডি নেতা এলি শ্লাইন বলেন, ‘জর্জা মেলোনিকে ইতালীয়দের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে৷ কারণ তার অবৈধ আলবেনিয়া প্রকল্পের খরচের হিসাব এ দেশের লাখো মানুষের জন্য অপমানজনক, বিশেষ করে যারা এখন জীবনযাপনের জন্য সংগ্রাম করছেন৷’
ইতালি-আলবেনিয়া চু্ক্তি
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার করা পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আলবেনিয়ায় শেনজেন ও জাদারে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে ইতালি।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইতালি এবং আলবেনিয়ার মধ্যে চুক্তিটি সই হয়৷ ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আলবেনিয়ার পার্লামেন্ট চুক্তিটির অনুমোদন দেয়৷ চুক্তি অনুসারে, আলবেনিয়ায় ইতালির নির্মাণ করা অভিবাসী কেন্দ্র দুটিতে বছরে ৩৬ হাজার অনিয়মিত অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের রাখা হবে এবং সেখানেই তাদের আশ্রয় আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের কথা ছিল৷
কিন্তু আদালতের বাধার মুখে আলবেনিয়ায় নির্মাণ করা কেন্দ্র দুটিতে একজন আশ্রয়প্রার্থীকেও রাখতে পারেনি ইতালি সরকার৷
আদালতের রায়ে পাল্টে যায় পরিকল্পনা
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারের পর এ নিয়ে বাংলাদেশসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ৭০ জনেরও বেশি অভিবাসীকে তিনটি দলে আলবেনিয়ায় স্থানান্তর করেছিল ইতালি। গত বছরের ১৬ অক্টোবর প্রথম জাহাজটি ১৬ জন অভিবাসী নিয়ে আলবেনিয়ায় পৌঁছায়৷ রোমের একটি আদালত এই স্থানান্তরকে বেআইনি এবং আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলে তা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার লঙ্ঘন বলে রায় দেয়৷ ফলে, সরকার বাধ্য হয়ে তাদের সবাইকে ইতালিতে ফিরিয়ে আনে৷
গত বছরের ৮ নভেম্বর আট জনের একটি দল এবং এ বছরের ২৮ জানুয়ারি ৪৯ জনের আরেকটি দলকে আলবেনিয়ায় পাঠায় ইতালি। দুই ক্ষেত্রেই রোমের আপিল আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, লুক্সেমবুর্গের ইউরোপীয় আদালত আশ্রয়প্রার্থীদের তাদের নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ কিনা তা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত তাদের আলবেনিয়ায় রাখা যাবে না৷
এমন প্রেক্ষাপটে আলবেনিয়ায় নির্মাণ করা আশ্রয়কেন্দ্র দুটিকে এখন সেন্টারস অফ পার্মানেন্স অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন (সিপিআর) অর্থাৎ অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে ইতালি।
আলবেনিয়া চুক্তিকে বলা হয় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির ফ্ল্যাগশিপ পরিকল্পনা৷ তাই কেন্দ্র দুটির বিকল্প ব্যবহার নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ২৮ মার্চ নতুন ডিক্রি জারি করে সরকার৷ এই ডিক্রি অনুসারে কেন্দ্র দুটিকে এখন সিপিআর বা অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হবে৷ তারই ধারাবাহিকতায় ইটালি থাকার বৈধতা হারানো আশ্রয়প্রার্থীদের আলবেনিয়ার জাদারে পাঠানো হচ্ছে৷ এখন পর্যন্ত ৪০ জন প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীকে সেখানে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে৷
সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস।
